Logo
HEL [tta_listen_btn]

মন্তব্য কলাম – ডাক্তারগণ যেন ব্যবসায়ী হয়ে না যান

মন্তব্য কলাম – ডাক্তারগণ যেন ব্যবসায়ী হয়ে না যান

ফরিদ আহমেদ রবি
প্রাচীনকালে নাগরিকের অধিকার হিসেবে চিহ্নিত ছিল খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান। বর্তমানে উক্ত ৩টি মৌলিক অধিকারের সাথে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা এবং স্বাস্থ্য। বাংলাদেশের সংবিধানে ১৫ এর (ক) ধারায় নাগরিকের জন্য উক্ত ৫টি বিষয় সাংবিধানিক চাহিদা হিসেবে উল্লেখিত আছে। ৫টি সাংবিধানিক চাহিদার অন্যতম স্বাস্থ্য আজকের আলোচ্য বিষয়। বেশ কিছুদিন ধরেই অবৈধ হাসপাতাল, ক্লিনিক, এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার চিহ্নিত করে জরিমানা ও উচ্ছেদ অভিযান চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষ তত্ত¡াবধানে এ অভিযান চলছে। এ সমস্ত অবৈধ স্থাপনা একদিনে গড়ে ওঠেনি। প্রথম থেকেই কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং তা প্রয়োগ করলে আজকে এই অবস্থার সৃষ্টি হতো না। উল্লেখিত স্থাপনা সমূহ গড়ে উঠেছে চিকিৎসার সাথে সম্পৃক্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ব্যক্তিবর্গের মাধ্যমে। এদের বড় একটি অংশ অবশ্যই চিকিৎসক। প্রশ্ন জাগে, এ সমস্ত চিকিৎসক তাদের সেবামূলক দায়িত্বের কথা ভুলে গেছেন কি? দেশের সবচেয়ে মেধাবী ছাত্রের একাংশ চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধ্যয়ন করে চিকিৎসক হিসেবে তাদের কর্মজীবন শুরু করেন। জনসেবা করার লক্ষ্যে চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করাই থাকে তাদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি সময়ের বিবর্তনে এদের বড় একটি অংশ সেবার পরিবর্তে চিকিৎসা প্রদানকে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রয়োগ করেন। তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতা ছাড়া এতগুলো অবৈধ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা সম্ভব হতো না। সেক্ষেত্রে এটা বলা খুব অন্যায় হবে না যে, তারা মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়েছেন। সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে চাকরির অধিকাংশ চিকিৎসকের ব্যক্তিগত চেম্বার রয়েছে। একই সাথে বিভিন্ন ক্লিনিকের সাথে তারা যুক্ত থাকেন। এ সমস্ত চিকিৎসক হাসপাতালে তার দায়িত্ব কতটুকু পালন করেন তাও প্রশ্ন সাপেক্ষ, কেননা অধিকাংশ রোগীকে তাদের চেম্বার অথবা ক্লিনিকে চিকিৎসা প্রদানেই তাদের আগ্রহ বেশি থাকে। অথচ এই চিকিৎসকই হাসপাতালে চিকিৎসা প্রদানের শর্তে মাসিক বেতন গ্রহণ করে চলেছেন। অসুস্থতার প্রকারভেদে কিছু রোগীর তাৎক্ষণিক অর্থাৎ জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন হয়, পাশাপাশি কিছু রোগ দীর্ঘস্থায়ী চিকিৎসার দাবি রাখে। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের অধিকাংশ রোগী তাদের প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়। দুর্ঘটনা,হার্ট অ্যাটাক এবং মাতৃত্বকালীন অসুস্থতা জনিত জরুরি প্রয়োজনে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় প্রাথমিক চিকিৎসাটুকুও অনেক সময় পাওয়া যায় না।এক্ষেত্রে উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন হাসপাতাল সবচেয়ে বড় দায়িত্ব পালন করেন রোগীকে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ বা অন্য হাসপাতালে রেফার করার মাধ্যমে, এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে চিকিৎসার অভাবে অনেক রোগী মৃত্যুবরণ করেন অথবা চিরকালীন পঙ্গুত্ব বরণ করেন। উপরোক্ত ভুক্তভোগীরা প্রাথমিক চিকিৎসা, উপজেলা বা জেলা পর্যায়ের হাসপাতালে কেন পায়না তা খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ সময়ের দাবি। বিশেষায়িত হাসপাতালসহ বাংলাদেশে ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে মোট সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৮৬৭টি (আগস্ট ২০২১)। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা প্রায় সব রোগীই দরিদ্র অথবা নি¤œবিত্ত শ্রেণীর। এসব হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থার সংস্কার প্রয়োজন,যাতে করে আগত রোগী চিকিৎসা বঞ্চিত না হয়। অন্ততঃ জরুরি চিকিৎসা প্রদানের পর যেন প্রয়োজনীয় হাসপাতালে স্থানান্তর করার ব্যবস্থা নেয়া হয়। এ লক্ষ্যে হাসপাতালে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে।।ধনীক শ্রেণীর চিকিৎসা প্রার্থী সবাই বেসরকারি হাসপাতাল অথবা অন্য দেশের হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণ করেন। বিদেশে চিকিৎসায় বছরে ব্যয় ৩০ হাজার কোটি টাকা (কালের কন্ঠ, ৩০ আগস্ট ২০২২)। চিকিৎসা ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং দেশে সম্ভব এমন চিকিৎসার জন্য বিদেশ প্রীতি কমিয়ে আনলে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হয়। দেশে সম্ভব এমন রোগের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত বিদেশে যান এমন একজন বন্ধুর কাছে কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওখানে চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশাপাশি যে সেবা পাওয়া যায় তা বাংলাদেশে পাওয়া যায়না। সব কিছু আইন করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না, অনেক ক্ষেত্রেই মানসিকতার পরিবর্তন, দায়িত্ববোধ, দেশাত্মবোধ সর্বোপরি বিবেকের কাছে জবাবদিহিতা অনেক বড় সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। চিকিৎসা ব্যবস্থার যে অবকাঠামো আমাদের দেশে রয়েছে তার সঠিক ব্যবহার উপরোল্লেখিত অনেক সমস্যার সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এক্ষেত্রে চিকিৎসা প্রদানকে শুধুমাত্র পেশা হিসেবে না নিয়ে সেবার মানসিকতা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক কর্মস্থলে তার দায়িত্ব পালন করে প্রাইভেট প্র্যাকটিস করবেন এটা অস্বাভাবিক নয়, অস্বাভাবিক তখনই যদি হাসপাতালের রোগীকে চেম্বারে আসতে বলা হয়। ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চেম্বার নিয়ে রোগী দেখা চিকিৎসকের সংখ্যা কম নয়। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো ও স্বাভাবিক, কিন্তু শুধুমাত্র কমিশন এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্বার্থে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো, একজন চিকিৎসককে তার মহান পেশার আদর্শ থেকে কোথায় নিক্ষেপ করছে তাও ভাবা দরকার। আমাদের সীমিত সামর্থ্যরে সুষ্ঠু ব্যবহার সারা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে। এজন্য চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে সেবার মানসিকতা নিয়ে। যেসব ব্যবসায়ী বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে হাসপাতাল তৈরি করছেন তারা যদি অধিক লাভের চিন্তা না করে স্বল্পলাভে বা বিনালাভে সেবার উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে আসেন তা হবে চিকিৎসা সেবার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। কেরানীগঞ্জে বসুন্ধরা হাসপাতাল, সাভারে সি.আর.পি হাসপাতাল,চকোরিয়ায় মেমোরিয়াল খ্রিস্টান হাসপাতাল এ জাতীয় উদ্যোগের উদাহরণ হতে পারে। অত্যন্ত অল্প খরচে এ সব হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়। আমাদের দেশে এমন অনেক ধনাঢ্য ব্যক্তি রয়েছেন যাদের পক্ষে সম্ভব এ ধরণের হাসপাতাল গড়ে তোলা। আমাদের দেশে অনেক বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে যেখানে দরিদ্র শ্রেণীর কেউই চিকিৎসা গ্রহণে সক্ষম নয়। মালিকপক্ষ আন্তরিক হলে এসব হাসপাতালে নির্দিষ্ট সংখ্যক বেড দরিদ্র লোকের জন্য নির্ধারিত রাখা যেতে পারে। উপরোল্লেখিত সব সমস্যার সমাধান এবং প্রস্তাব সমূহ বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে চিকিৎসা সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষকে যাতে চিকিৎসা শুধুমাত্র পেশা হিসেবে থাকবেনা, হয়ে উঠবে চিকিৎসা সেবা। লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানি ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Theme Created By Raytahost.Com