Logo
HEL [tta_listen_btn]

একের পর এক খুনের ঘটনায় জনমনে আতংক  না’গঞ্জ যেন খুনের নগরী

একের পর এক খুনের ঘটনায় জনমনে আতংক  না’গঞ্জ যেন খুনের নগরী

মনজুরুল ইসলাম

নারায়ণগঞ্জ যেনো খুনের শহরে পরিণত হয়েছে। হরহামেশাই ঘটছে খুনের ঘটনা। একটি খুনের রেশ কাটতে না কাটতেই আরেকটি খুন হচ্ছে। এতে আইন-শৃংখলার চরম অবনতি দেখা দিয়েছে। এরআগে নারায়ণগঞ্জে ৪টি খুনের ঘটনা ঘটে। বৃহস্পতিবার (৩ নভেম্বর) দিবাগত রাতে রূপগঞ্জে ২ গৃহবধূকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। একই রাতে ছাত্রদল নেতাকে মাইক্রোবাসের নিচে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠে। অন্যদিকে, ফতুল্লায় ডোবা থেকে অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতরা হলো, নবাবগঞ্জের ভাগুলিয়া গ্রামের বৃষ্টি আক্তার (২৫), খুলনার খালিসপুরের জান্নাতুল ফেরদৌস জ্যোতি (২৩), কাঞ্চন পৌরসভার ৫নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মো. অমিত হাসান অনিক (২২) ও ফতুল্লার ডোবা থেকে উদ্ধার হওয়া হাসান। এই খুনের রেশ না কাটতেই সোমবার (৭ নভেম্বর) আরো ৪ জনের লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। বন্দরে নিখোঁজের ২ দিন পর মাসুম (৩৫) নামে এক ভ্যানচালকের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ এবং মাদকাসক্ত ছেলে সজিবের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন মা আয়েশা বেগম (৪৫)। অন্যদিকে রূপগঞ্জে রাশেদ (২৫) নামে এক তেলব্যবসায়ী ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন। সর্বশেষ, সোমবার (৭ নভেম্বর) রাতে নিখোঁজের ৩ দিন পর সিদ্ধিরগঞ্জে ফারদিন নূর পরশ (২৪) নামে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। এরআগে সোমবার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের বনানীঘাট সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদী থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। জানা গেছে, রূপগঞ্জে পারিবারিক কলহের জের ধরে পৃথক দু’টি ঘটনায় বৃষ্টি আক্তার (২৫) ও জান্নাতুল ফেরদৌস (২৩) নামে ২ গৃহবধূকে তাদের স্বামী হত্যা করে। এদের মধ্যে বৃষ্টি আক্তারকে গলাকেটে ও জান্নাতুল ফেরদৌসকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়। বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আমলাবো ও তারাব পৌরসভার মৈকুলী এলাকায় এ হত্যাকেন্ডর ঘটনা ঘটে। নিহত বৃষ্টি আক্তার ঢাকার নবাবগঞ্জ থানার ভাগুলিয়া এলাকার জনু মোল্লার মেয়ে ও নিহত জান্নাতুল ফেরদৌস খুলনার খালিশপুর এলাকার জহিরুল ইসলামের মেয়ে। অভিযুক্ত ঘাতকদের মধ্যে বৃষ্টি আক্তারের স্বামী ইমন গাজীকে পুলিশ ও জান্নাতুল ফেরদৌসের স্বামী আবদুল্লাহ চৌধুরী ওরফে রাসেলকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। স্থানীয় ও প্রতিবেশীরা জানান, গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আমলাবো এলাকার ডলি নামে এক মহিলার বাড়িতে স্বামী ইমন গাজী ও স্ত্রী বৃষ্টি আক্তার ৫ বছর ধরে ভাড়ায় বসবাস করে আসছেন। ইমন গাজী রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন। কয়েকদিন ধরে বৃষ্টির সাথে তার স্বামী ইমনের পারিবারিক কলহ চলছিলো। এর জের ধরে বৃহস্পতিবার রাতে সাড়ে ৩টার দিকে তাদের মধ্যে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে স্ত্রী বৃষ্টিকে ছুরিকাঘাত করে ইমন। পরে তাকে গলা কেটে হত্যা করে। এসময় বৃষ্টির চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে গিয়ে ঘটনা দেখে থানায় ফোন করে। পরে পুলিশ গিয়ে ইমন গাজীকে গ্রেফতার করে। অপরদিকে, ফেসবুকে পরিচয়ের মাধ্যমে জান্নাতুল ফেরদৌস ও আবদুল্লাহ চৌধুরী ওরফে রাসেলের বিয়ে হয়। জান্নাতুল ও তার স্বামী তারাব পৌরসভার মৈকুলী এলাকায় একটি বাড়িতে ভাড়া থাকতো। কিন্তু স্বামী আবদুল্লাহ তার প্রথম বিয়ের কথা গোপন করে। কিছুদিন আগে জান্নাতুল ফেরদৌস জানতে পারেন। এ নিয়ে তাদের মধ্যে পারিবারিক কলহ চলছিলো। বৃহস্পতিবার রাতে দু’জনের মধ্যে এ নিয়ে ঝগড়া হয়। একপর্যায়ে আবদুল্লাহ ঘর থেকে বেরিয়ে প্রতিবেশীদের রুমের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে ঘরে ফিরে আসেন এবং স্ত্রীকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যান। আহত অবস্থায় জান্নাতুল ফেরদৌসকে উদ্ধার করে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। জান্নাতের গলায় ও বুকে ছুরির আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। হত্যাকান্ডের পর রাসেল পালিয়ে যায়। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে র‌্যাব-১১ ও র‌্যাব-৭ এর যৌথ আভিযানিক দল শুক্রবার (৪ নভেম্বর) দিবাগত রাতে ফেনী জেলার সদর থানা এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে আব্দুল্লাহ চৌধুরী ওরফে রাসেলকে গ্রেফতার করে। এদিকে, বৃহস্পতিবার মাইক্রোবাস চাপায় নিহত ছাত্রদল নেতা অনিকের মৃত্যুর বিষয়ে জেলা যুবদলের সদস্য সচিব মশিউর রহমান রনি বলেন, তারেক রহমান ও তার স্ত্রী জোবায়েদা রহমানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারির প্রতিবাদে রূপগঞ্জে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মশাল মিছিল বের করেছিলেন। মিছিলের প্রায় শেষ পর্যায়ে হঠাৎ ৩টি মোটরসাইকেল করে ৯ জন লাঠিসোটা, রামদা ও রড নিয়ে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ নেতাকর্মীরা মিছিলে হামলা চালায়। এসময় মোট ৬ জন আহত হয়। নিহত অনিককে মারধর করে এবং একটি মাইক্রোবাসের সামনে ফেলে দেয়। পরে গুরুতর আহতাবস্থায় ছাত্রদল নেতা অনিককে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে সেখানে রক্ত শূন্যতার কারণে আমরা ২ ব্যাগ রক্ত দিয়েছিলাম। কিন্তু রাত ১২টার সময় চিকিৎসাধীন অবস্থায় অনিকের মৃত্যু হয়। এ ঘটনাকে হত্যাকান্ড বলে দাবি করে মশিউর রহমান রনি বলেন, রড দিয়ে বাড়ি দেয়ার পর যখন মাইক্রোবাসের সামনে ফেলে দেয়, এটা অবশ্যই হত্যাকান্ড। অপরদিকে, শুক্রবার সকালে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলা ফতুল্লার পিলকুনী এলাকায় একটি ডোবা থেকে অজ্ঞাত পরিচয়ে এক যুবকের লাশ উদ্ধারের বিষয়ে ঘটনাস্থলে যাওয়া ফতুল্লা মডেল থানার উপ-পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন জানান, নিহতের লাশ রাস্তা পাশে ভোবায় ভাসতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবরদেয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠায়। পরে ডোবা থেকে উদ্ধারকৃত লাশের পরিচয় মিলেছে। নিহত যুবকের নাম মো. হাসান (৩০)। সে কুষ্টিয়ার বাজের মাঝির দৌলতপুরস্থ আবু সামেদ মিয়ার ছেলে। পেশায় অটোরিকশা চালক। নিহত হাসান তার স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে ফতুল্লার কাশিপুর খিল মার্কেটস্থ মজিবরের বাসায় ভাড়ায় বসবাস করতো। তাদের সংসারে সীমান্ত (১১) নামে একটি ছেলে ও ইলমা (২) নামক একটি মেয়ে রয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত ১০টার দিকে রাতের খাবার খেয়ে বাসা থেকে বের হয় হাসান। পরবর্তীতে মনিরের গ্যারেজ থেকে অটোরিকশা নিয়ে যায়। সকালে বাসায় ফিরে না আসায় গ্যারেজে গিয়ে জানতে পারি, হাসান অটোরিকশা নিয়ে বের হয়ে আর ফিরে আসেনি। শুক্রবার সারাদিন পেরিয়ে শনিবার সকালেও বাসায় ফিরে না আসায় এবং খোঁজ না পাওয়ায় থানায় সাধারণ ডায়েরি করার জন্য আসি। থানায় এসে লাশ উদ্ধারের ঘটনা জানতে পারি এবং ছবি দেখে শনাক্ত করি আমার স্বামীর লাশ। রোববার (৬ নভেম্বর) দিবাগত রাতে বন্দরে মাদকাসক্ত ছেলে সজিব (৩০) এর ছুরিকাঘাতে খুন হয়েছেন মা আয়েশা বেগম (৪৫)। মুছাপুর ইউনিয়ন জহরপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। নিহত আয়েশা বেগম ওই এলাকার রফিক মিয়ার স্ত্রী। আয়েশা বেগমের সাথে প্রায় সময়ই সজিবের টাকা পয়সা নিয়ে কথা কাটাকাটি হত। রোববার দিবাগত রাতে ঘুমের মধ্যে সজিব তার মা আয়েশা বেগমের মুখে বালিশ চাপা দিয়ে এলোপাতাড়িভাবে গলায় ছুরিকাঘাত করে। এসময় আয়েশার ডাক চিৎকারে তার ছোট বোন আঞ্জুমান ছুটে এসে আয়েশা বেগমকে মাটিতে মৃত অবস্থায় দেখতে পায়। একপর্যায়ে সজীব তার মাকে রেখে পালিয়ে যায়। খবর পেয়ে কামতাল তদন্ত কেন্দ্রের পুলিশ লাশ উদ্বার করে ময়নাতদন্তের জন্য নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে প্রেরণ করে। নিহতের গলা, হাত এবং পেটে ছুরিকাঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এদিকে, রূপগঞ্জে রোববার (৬ নভেম্বর) দিবাগত রাত ১টার দিকে ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে রাশেদ (২৫) নামে এক চোরাই তেল ব্যবসায়ী খুন হয়েছেন। তবে পুলিশ বলছে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাত নয় ঘটনাটি পারিবারিক ঘটনা। তাদের মধ্যে টাকা পয়সার লেনদেন ছিলো, তা নিয়েই এ হত্যাকান্ডের সূত্রপাত। নিহত রাশেদ ভোলা জেলার লালমহন উপজেলার ধলীগৌর নগর এলাকার আলাউদ্দিনের ছেলে। তিনি উপজেলার গোলাকান্দাইল ইউনিয়নের আধুরীয়া বাসস্ট্যান্ডের পাশেই চোরাই তেলের ব্যবসা করতেন। এ ঘটনায় রূপগঞ্জ থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিজানুর রহমান ৩ জনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করেছেন। অপরদিকে, সোমবার (৭ নভেম্বর) সকালে নিখোঁজের ২ দিন পর মাসুম (৩৫) নামে এক ভ্যানচালকের মরদেহ উদ্ধার করেছে বন্দর থানা পুলিশ। বন্দরের পুরান কবরস্থান গণপাড়া বিল এলাকার ডোবা থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিহত মাসুমের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে তার নাড়ি ভুঁড়িও বের হয়ে গেছে। মাসুম বাগেরহাট জেলার মো. সিকান্দার মিয়া ছেলে। সে বন্দর চিতাশাল আল আমিন বাড়িতে পরিবার নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকতো। সর্বশেষ, সোমবার (৭ নভেম্বর) রাতে নিখোঁজের ৩ দিন পর সিদ্ধিরগঞ্জে ফারদিন নূর পরশ (২৪) নামে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক শিক্ষার্থীর লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। এরআগে সোমবার বিকেলে সিদ্ধিরগঞ্জের বনানীঘাট সংলগ্ন শীতলক্ষ্যা নদী থেকে লাশটি উদ্ধার করা হয়। নিহত ফারদিন নূর পরশ ফতুল্লার দেলপাড়া কুতুবপুরের নয়ামাটি এলাকার কাজী নুরুদ্দীন রানার ছেলে। তবে তারা বর্তমানে ঢাকার ডেমরার শান্তিবাগ কোনাপাড়া এলাকায় বসবাস করে। পরশ বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। নিহত ফারদিন নূর পরশ শুক্রবার (৪ নভেম্বর) থেকে নিখোঁজ ছিলো।

 


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Theme Created By Raytahost.Com