Logo
HEL [tta_listen_btn]

মন্তব্য কলাম    ওষুধ শিল্পে অপচর্চা চাই না

মন্তব্য কলাম    ওষুধ শিল্পে অপচর্চা চাই না

ফরিদ আহমেদ রবি
দায়ে না পড়লে ধনী গরীব নির্বিশেষে কেউই ওষুধ খেতে চায় না। জরুরি অবস্থায় যেমন ওষুধের প্রয়োজন তেমনি কিছু কিছু রোগের ক্ষেত্রে দীর্ঘ মেয়াদে ওষুধ ব্যবহার আবশ্যক হয়ে পড়ে। দেশের অধিকাংশ লোকই নি¤œ এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণির। সংসারের দৈনন্দিন চাহিদা মিটিয়ে ওষুধের ব্যয় বহন করা অনেকের জন্যই কষ্টকর। তারপরেও কষ্টেসৃষ্টে ওষুধ ক্রয় করতেই হয়। স¤প্রতি বিভিন্ন ওষুধের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এই শ্রেণিটিকে অসহায় অবস্থায় নিপতিত করেছে। গার্মেন্টস শিল্পের অভাবনীয় সাফল্য বাংলাদেশকে দিয়েছে অর্থনৈতিক দৃঢ় ভিত্তি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং দেশীয় কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান শিল্প হয়ে উঠেছে গার্মেন্টস। গার্মেন্টস শিল্পের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় শিল্প হয়ে উঠছে ওষুধ শিল্প। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিশ্বের প্রায় ১৬০টি দেশে বাংলাদেশ ওষুধ রপ্তানী করছে। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধ ও ওষুধের কাঁচামাল দেশে উৎপন্ন করছে। এসব ওষুধ ও কাঁচামাল দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে। ওষুধ শিল্পে এই অভাবনীয় সাফল্য এসেছে মূলত ১৯৮২ সালে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ জারি হওয়ার ফলে। ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ ওষুধ উৎপাদন ও বাজারজাত করা ছিল বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর নিয়ন্ত্রণে। ১৯৮২ সালে প্রণীত ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের ফলে বহুজাতিক কোম্পানীগুলোর একচেটিয়া বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। দেশীয় ওষুধ শিল্পের বাজার স¤প্রসারণ শুরু হয়। সেই অবস্থা থেকে সময়ের ব্যবধানে আজ দেশের কোম্পানীগুলো প্রয়োজনীয় সব ওষুধ উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করেছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বহিঃবিশ্বেও রপ্তানী শুরু করেছে। সঠিক ভাবে পরিচর্যা করা গেলে ওষুধ শিল্পের রপ্তানী বাজার বহুগুণ বৃদ্ধি করে মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ সম্ভব। একসময় বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও আমদানির উপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থান নিঃসন্দেহে আনন্দের। এক সময় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হতো ওষুধ আমদানির জন্য। সেই অবস্থা কাটিয়ে ওঠার কৃতিত্ব ওষুধ উৎপাদনে সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের দিতেই হবে, পাশাপাশি কৃতজ্ঞতা জানাতে হয় জাতীয় ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ প্রণেতাদের। ওষুধ শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি দেশের গর্বিত নাগরিক হিসেবে এ শিল্পের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক বেশি। অথচ আজকের এই লেখাটি লিখতে হচ্ছে চরম হতাশা নিয়ে। যে দেশ বহিঃবিশ্বে ওষুধ রপ্তানী করছে সে দেশের সাধারণ জনগণ নিয়ন্ত্রণহীন ওষুধের মূল্যবৃদ্ধির কারণে চরমভাবে বিপর্যস্ত এবং হতাশাগ্রস্থ। দিন দিন বেড়েই চলেছে ওষুধের দাম। জরুরি অবস্থা ছাড়াও কিছু কিছু রোগের জন্য অনেককে নিয়মিত ওষুধ খেতে হয়। পেটের ক্ষুধা মেটাতে না পারলেও অনেককেই ওষুধের খরচ বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থ ব্যয় করতেই হয়। ২০২২ সালের ৩০ জুন ৫৩টি ব্রান্ডের ওষুধের দাম শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২০ নভেম্বর একটি কোম্পানীর ২৩টি ওষুধের দাম বাড়ানো হয়েছে (কালের কণ্ঠ, ২৪ নভেম্বর)। গত ৬ মাসে ওষুধের দাম প্রায় ৭৫ শতাংশ বেড়েছে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণির অবস্থা এমনিতেই নাজুক তার ওপর ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি, নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হয় এমন শ্রেণিকে একেবারে অসহায় করে ফেলেছে। দেশের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের তথ্য অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যয় বহন করতে গিয়ে প্রতিবছর ৮৬ লাখ মানুষ আর্থিক সমস্যায় পড়ে। ব্যয় বেশি হওয়ার কারণে ১৬ শতাংশ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ থেকে বিরত থাকে। ওষুধের মূল্য বৃদ্ধিতে এই পরিসংখ্যানের আরও অবনমন হবে তা বলাই বাহুল্য। প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য ১১৭টি ওষুধ তালিকাভুক্ত। এসব ওষুধের দাম নির্ধারণ করে সরকার। এসব ওষুধের দাম তুলনামূলকভাবে কম বেড়েছে। বাকি সব ওষুধের দাম নির্ধারণ করে উৎপাদনকারী কোম্পানীগুলো। সরকারের কোন নিয়ন্ত্রণ না থাকায় দাম নির্ধারণে কোম্পানীগুলো ইচ্ছেমত দাম নির্ধারণ করে থাকে। এক্ষেত্রে তাদের লক্ষ্য থাকে অধিক মুনাফা। এবার ব্যাপক হারে মূল্যবৃদ্ধির স্বপক্ষে যুক্তি হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট সমস্যা, আন্তর্জাতিক বাজারে বিভিন্ন উপকরণের দামবৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি ইত্যাদি ইত্যাদি! তাই বলে শতভাগ মূল্যবৃদ্ধি! অবিশ্বাস্য! সরকারি নিয়ন্ত্রণ না থাকাই এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধির কারণ। কোম্পানী ভেদে একই জেনেরিক ওষুধের ভিন্ন ভিন্ন দাম কেন? নামিদামী কোম্পানীগুলো ওষুধের দাম অধিক হারে বৃদ্ধি করছে, পাশাপাশি কম নামিদামী কিছু কোম্পানী তুলনামূলক কম দামে ওষুধ বাজারজাত করছে। ক্রেতারা সাধারণত নামিদামী কোম্পানীর ওষুধের দিকেই ঝুঁকে থাকে এটাই স্বাভাবিক। একথা নিশ্চয়ই বলা যাবে না কোম্পানী ভেদে ওষুধের গুণগত মান ওঠানামা করে, কারণ ওষুধের গুণগত মান নির্দিষ্ট মাত্রায় না থাকলে কোন অবস্থাতেই তা বাজারজাত করা যায় না। মান নিয়ন্ত্রণের কাজটি কিন্তু সরকারি সংস্থার হাতেই। যেসব কোম্পানী দাম কম রাখছে সেক্ষেত্রে একথা বলা কি সম্ভব যে তাদের ওষুধ গুণগত মান সম্পন্ন নয়? গুণগত মান ঠিক না থাকলে ওষুধ কিভাবে বাজারে আসার অনুমোদন পায় ? তাহলে কি ধরে নেয়া যায় এখানেও দুর্নীতি ঢুকেছে! গুণগত মান বজায় রেখেই যদি ওষুধ বাজারজাত করা হয়ে থাকে তাহলে দামের এত তারতম্য কেন? এসব প্রশ্ন উঠছে এবং উঠতেই থাকবে যতক্ষণ না ওষুধের বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আসবে। সব ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা সরকারি সংস্থার হাতেই থাকা উচিত। কারণ নিয়ন্ত্রণ না থাকার কারণে ফলাফল কি হচ্ছে তা তো দেখাই যাচ্ছে। বিভিন্ন ওষুধ কোম্পানী বিপণন কর্মে নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করে থাকে, যা এখন আর গোপনীয় নয়। বিভিন্ন চিকিৎসকের চেম্বারে বিপণন কর্মীদের ভিড় লেগেই থাকে। চিকিৎসকদের প্রদান করা হয় স্যাম্পলের নামে প্রচুর পরিমাণ ওষুধ সামগ্রী যা প্রকারান্তরে ওষুধের দোকানে চলে আসে। কমিশনের নামে কোন কোন ওষুধ প্রায় অর্ধেক দামে ফার্মেসীতে বিক্রি করা হয়। চিকিৎসকদের বিভিন্ন দামি উপঢৌকন দেয়া তো রেয়াজে পরিণত হয়েছে। বিপণনের নামে বিশাল অংকের অর্থ প্রতিটি কোম্পানীই ব্যয় করে থাকে। ওষুধের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে এ ধরনের বিপণন ব্যয়ও প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। এই অনাকাঙ্খিত বিপণন ব্যয় কমানো গেলে ওষুধের মূল্য অনেকটা কমানো সম্ভব। বহুজাতিক কোম্পানীগুলো একচেটিয়া ব্যবসা করে এদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজ নিজ দেশে নিয়ে গেছে এ কথা শতভাগ সত্য, তবে এটাও মানতে হবে তারা কখনোই বিপণনের নামে ঘুষ প্রথা চালু করেনি। মাননিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও তারা ছিল আপোষহীন, তাই অধিকাংশ চিকিৎসক নিজ স্বার্থেই বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানীগুলোর ওষুধ নির্দ্বিধায় প্রেসক্রাইব করতেন। ওষুধ বিপণনের নামে অনৈতিক কার্যক্রম অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত। এ লক্ষ্যে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে। জাতীয় স্বার্থে ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ প্রণীত হওয়ার ফলে দেশীয় ওষুধ শিল্পের স¤প্রসারণ হয়েছে ঠিকই তবে সাধারণ মানুষ তার সুফল ভোগ করতে পারছে না। যুগান্তকারী ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশের আদলে এমন একটি নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে সাধারণ মানুষ এ শিল্পের উন্নতির সুফল ভোগ করতে পারে। দীর্ঘদিন ওষুধ কোম্পানীর সাথে সংযুক্ত ছিলাম বলে স¤প্রতি দেশের একটি প্রায় অখ্যাত কোম্পানী থেকে চাকরির অফার আসে। আর চাকরি করব না বলে সিদ্ধান্ত আগেই নেয়া ছিল, তারপরও তাদের আগ্রহের কারণে কোম্পানী সম্পর্কে খুঁটিনাটি জানতে চাইলাম। মালিক কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী জানতে পারলাম ওষুধের নেট মূল্যের অর্ধেক পেলেই মালিকপক্ষ সন্তুষ্ট থাকবেন। তারমানে নির্ধারিত মূল্যের অর্ধেক পেলেও মালিকপক্ষ লাভবান হবেন। বিষয়টি সম্পর্কে আগ্রহ বেড়ে যাওয়ায় কয়েকটি ফার্মেসী মালিকের সাথে কথা বললাম। তাদের ভাষ্যমতে, বেশ কিছু কোম্পানী ওষুধ ব্যবসায়ীদের ৪০% পর্যন্ত ছাড় দিয়ে ব্যবসা করতে আগ্রহী। এক্ষেত্রে ফার্মেসী মালিককেই উদ্যোগ নিয়ে ওষুধ বিক্রি করতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে ওষুধ উৎপাদন ব্যয় এবং বিক্রয় মূল্যের তফাৎ এত বেশি কেন? বৈশ্বিক বিভিন্ন সংকটের কারণে ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি যদি খুবই জরুরি হয়, সেক্ষেত্রে এ ধরনের অপচর্চা এবং ওষুধ কোম্পানীগুলোর অধিক মুনাফা লাভের প্রয়াস বন্ধ করতে পারলে ওষুধের মূল্য না বাড়িয়ে বরং আরও কমানোর সুযোগ আছে। অধিক মুনাফা লাভের জন্য অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে নজর সরিয়ে রপ্তানী বাণিজ্যের পথে হাটলে একদিকে যেমন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ আসবে পাশাপাশি দেশবাসী উপকৃত হবে সুলভ মূল্যে ওষুধ পেয়ে। ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবকাঠামো আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়েছে তাই বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওষুধ শিল্প হতে পারে গার্মেন্টস শিল্পের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় রপ্তানী শিল্প। বেশ কিছু কোম্পানী তাদের উৎপাদিত পণ্য বিদেশে রপ্তানী করছে। ধীরে ধীরে রপ্তানীর পরিমাণও বাড়ছে, এই ধারা অব্যাহত রাখা এবং তা আরো গতিশীল করা খুবই প্রয়োজন দেশ ও জাতির স্বার্থে। ওষুধ শিল্পের সার্বিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী পরিকল্পনা এবং তার সঠিক বাস্তবায়ন। দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে পুঁজি না করে রপ্তানী বাণিজ্যের দিকে দৃষ্টি স¤প্রসারণ করলে বাংলাদেশ হতে পারে ওষুধ শিল্পের অন্যতম প্রধান রপ্তানীকারক দেশ। দেশের সার্বিক স্বার্থ বিবেচনায় শিল্পোদ্যোক্তা এবং সরকারের নীতিনির্ধারক মহল সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসলে ওষুধ শিল্প হয়ে উঠবে জনবান্ধব একটি শিল্প। দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি হবে আরও দৃঢ়। এ প্রচেষ্টা সফল করার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন সম্ভাবনাময় এই শিল্পে যে সমস্ত অপচর্চা চলছে তা নিবারণ করা এবং সঠিক নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে এগিয়ে যাওয়া।
লেখক: বহুজাতিক ওষুধ কোম্পানী ও পোশাক শিল্পের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Theme Created By Raytahost.Com