Logo
HEL [tta_listen_btn]

ফতুল্লায় মুক্তিযোদ্ধা হত্যা……ছেলের ভাড়াটে কিলারের হাতে পিতা খুন

ফতুল্লায় মুক্তিযোদ্ধা হত্যা……ছেলের ভাড়াটে কিলারের হাতে পিতা খুন

ফতুল্লা সংবাদদাতা
ফতুল্লায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম (৭২) কে হত্যার চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। বোনদের ঠকিয়ে ব্যাংক থেকে তোলা ৩০ লাখ টাকা একাই আত্মসাতের লোভে ভাড়াটে কিলার দিয়ে বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমকে হত্যা করান তার ছেলে হাফেজ এইচ এম মাসুদ। ঘাতক ব্যাটারিচালিত ইজিবাইক চালক রুবেল (২৭) কে গ্রেফতার করা হয়েছে। সে আদালতে স্বীকারোক্তীমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকান্ডের আদ্যপ্রান্ত বর্ণনা করেছে। রোববার (১২ ফেব্রæয়ারি) দুপুরে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) জেলা কার্যালয়ের পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে এ তথ্য জানান। পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম জানান, মৃত্যুর ২ মাস আগে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম ব্যাংক থেকে তোলা ৩০ লাখ টাকা আত্মসাতের লোভে ৫ লাখ টাকায় ভাড়াটে খুনি দিয়ে বাবাকে হত্যা করান তার ছেলে এইচএম মাসুদ। হত্যা ঘটনার সঙ্গে জড়িত আলামত ও বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডড্রাইভ (ডিভিআর) উদ্ধারের পর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছে মামলার তদন্তকারী সংস্থা পিবিআই। এরআগে, ১ ফেব্রæয়ারি সকালে ফতুল্লার এনায়েতনগর ইউনিয়নের মাওলাবাজার এলাকায় নিজ বাসা থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় তার একমাত্র ছেলে মাসুদ দাবি করেন, ৩১ জানুয়ারি দিবাগত রাতে তাদের বাসায় ঢুকে তার হাত-পা ও মুখ বেঁধে বৃদ্ধ বাবাকে খুন করে নগদ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার লুট করে নিয়ে গেছে ডাকাত দল।
যেভাবে হত্যা করা হয়
পিবিআই জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে আসামী রুবেল জানিয়েছে, ব্যাংক থেকে তোলা বাবার ৩০ লাখ টাকা একাই আত্মসাতের লোভে মাসুদ নিজের বাবাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। নিহতের ছেলে মাসুদ ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে রুবেলকে ভাড়া করে। ঘটনার দিন রাত ১০টায় মাসুদের ফোন পেয়ে তাদের বাড়িতে যায় রুবেল। রুবেলের জন্য বাসার কলাপসিবল গেট ও ফ্ল্যাটের দরজা আগে থেকেই খোলা রাখে মাসুদ। রাত ১১টার দিকে আব্দুল হালিম ঘুমিয়ে পড়লে মাসুদ তার বাবার হাত-পা চেপে ধরে এবং রুবেল তার গলা টিপে শ্বাসরোধের চেষ্টা করে। বৃদ্ধ আব্দুল হালিম চিৎকার করার চেষ্টা করলে রুবেল তার মুখের ওপর বালিশ চাপা দেয়। পরে মাসুদ তার কক্ষে থাকা রক্তচাপ মাপা যন্ত্রের সাহায্যে মৃত্যুর ব্যাপারে নিশ্চিত হন। পরিকল্পনা অনুযায়ী রুবেলকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডড্রাইভ বাইরে কোথাও ফেলে দিতে বলে মাসুদ। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ডাকাতির নাটক সাজাতে মাসুদকে পাটের দড়ি দিয়ে হাত-পা ও গামছা দিয়ে মুখ বেঁধে রেখে যায় রুবেল। পিবিআই এর পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম বলেন, রুবেলকে তার বোনের বাসা থেকে গ্রেফতারের পর তার দেয়া তথ্যমতে ফতুল্লায় ভাড়া বাসার ড্রেসিং টেবিলের ড্রয়ার থেকে ৪ লাখ ৪৩ হাজার টাকা জব্দ করা হয়। এছাড়া নিহত আব্দুল হালিমের বাড়ির পেছন থেকে সিসিটিভি ক্যামেরার হার্ডড্রাইভ উদ্ধার করা হয়। আলামত হিসেবে হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত পাটের দড়ি, গামছা, বালিশ, ডিজিটাল বøাড প্রেসার মাপার মেশিন জব্দ করা হয়।
তিনি জানান, আসামী রুবেল শনিবার বিকেলে জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট ইমরান মোল্লার আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। মামলার অপর আসামী মাসুদকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।
হত্যার নাটক
১ ফেব্রæয়ারি রাতে ফতুল্লা মডেল থানায় অজ্ঞাত আসামী করে মামলা করেন নিহতের জামাতা জাহের আলী। মামলার এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, নিহত বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিমের ১ ছেলে ও ২ মেয়ে। মেয়েরা তাদের শ্বশুর বাড়ি থাকে। বাদির শাশুড়ি মারা যাওয়ার পর শ্বশুর ও তার একমাত্র ছেলে মাসুদ তার স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মাওলাবাজারের নিজ বাড়িতে দ্বিতীয়তলার একটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। ৩১ জানুয়ারি রাত আড়াইটার দিকে লোক মারফত তিনি জানতে পারেন, তার শ্বশুরবাড়িতে বড় ধরনের ডাকাতি হয়েছে। তৎক্ষণাৎ বাড়ি ফিরে দেখেন তার শ্বশুর খাটের উপর মৃত পড়ে আছেন। তার শ্যালক জানান, দু’দিন আগে তার স্ত্রী-সন্তান শ্বশুরবাড়ি গেছেন। রাত ১০টার দিকে খাওয়া-দাওয়া শেষে শ্বশুর ও শ্যালক নিজ কক্ষে শুয়ে পড়েন। এজাহারে আরও বলা হয়, রাত ১০টা থেকে সোয়া ২টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ৩ জন অজ্ঞাত ব্যক্তি শ্যালকের কক্ষে ঢুকে তাকে পাটের রশি দিয়ে হাত-পা ও মুখ গামছা দিয়ে বেঁধে শ্বশুরের কক্ষে গিয়ে ভয় দেখিয়ে আলমারিতে থাকা শ্বশুরের ৩০ লাখ ও শ্যালকের ২ লাখ টাকা লুট করে। শ্বশুরের টাকা ২ মাস আগে আইএফআইসি ইসলামী ব্যাংক থেকে তোলা হয়। টাকা লুট করার পর আসামীরা সিসিক্যামেরার হার্ডড্রাইভ নিয়ে যায়। বাধা দিলে শ্বশুরকে শ্বাসরোধ করে খুন করে পালিয়ে যায়। আসামীরা চলে যাওয়ার পর শ্যালক হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় দরজা ধাক্কালে শব্দ পেয়ে ভাড়াটিয়া মাহিনুর (৪০) ও তার স্বামী দেলোয়ার (৪৫) ফ্ল্যাটের দরজা খুলে ঘরের ভেতর প্রবেশ করে তার শ্যালকের হাত ও মুখের বাঁধন খুলে দেয়।
এ মামলাটি থানা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ছায়াতদন্ত করে বলে জানান, পিবিআই পুলিশ সুপার মনিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ১০ ফেব্রæয়ারি মামলার তদন্তের দায়িত্ব নেয় পিবিআই। দায়িত্ব পাওয়ার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এসআই শাকিল হোসেন ও এসআই কামরুল হাসানকে নিয়ে ঘটনার রহস্য উদঘাটন করেন তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাজহারুল ইসলাম। পিবিআই বলেন, মামলার দায়িত্ব পাওয়ার পর পুনরায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে পিবিআই। তদন্তে তারা জানতে পারে, নিহতের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল ইজিবাইক চালক মো. রুবেলের। কিন্তু ঘটনার ২ দিন পর থেকে তার কোনো খোঁজ নেই। তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘটনার দিন রুবেলের উপস্থিতি ভুক্তভোগীর বাড়ির আশপাশে পাওয়া যায়। সন্দেহভাজন হিসেবে শনিবার রাজধানীর যাত্রাবাড়ি থানা এলাকায় বোনের বাসা থেকে রুবেলকে গ্রেফতার করা হয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে সে ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করে। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বাকীরোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেয়।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *


Theme Created By Raytahost.Com