নিজস্ব সংবাদদাতা:
তখন ভর দপুর। ভাদ্রের চড়া রোদ আকাশে। এক বছরের শিশু কন্যা তানহাকে কোলে নিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা আদালতের ফটকে দাড়িয়ে আছেন শারমিন আক্তার। প্রচন্ড গরম ও রোদের তীব্রতায় তেষ্টা পায় শিশু তানহার। দোকান থেকে ৫০০ মিলি’র একটি পানির বোতল কেনেন শারমিন। অর্ধেক বোতলের পানি শেষ করার পরও ‘মাম মাম’ বলে কাঁদছিল তানহা। নানা ঝামেলায় বিরক্ত শারমিন ধমক দিলেন মেয়েকে। শারমিন আক্তার বলেন, ‘গত কয়দিন ধইরা খালি কোর্টে ঘুরতাছি। খাওয়া-দাওয়ার কোন ঠিক নাই। বাসায় ১১ বছরের প্রতিবন্ধী একটা মাইয়া। নড়াচড়া কিছুই করতে পারে না। তারে দেখার কেউ নাই। সাত বছরের আরেক মাইয়ার জিম্মায় তারে থুইয়া আইছি। কোলের মাইডারে লইয়া ঘুরতাছি। কী করমু কোন দিশা পাইতাছি না!’ শারমিন আক্তারের স্বামী নৌকার মাঝি খলিল কারাগারে। জিসা মনি নামে এক স্কুল ছাত্রীকে অপহরণের মামলায় গ্রেফতার হন। একই মামলায় গ্রেফতার আব্দুল্লাহ (২২) ও রকিব (১৯) নামে দুই তরুণও কারাগারে। পুলিশ জানায়, জিসা মনিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার কথা ১৬৪ ধারায় আদালতে জবানবন্দি দিয়েছে এই তিনজন। অথচ জিসা মনি দিব্যি বেঁচে আছে। তাকে অপহরণ, ধর্ষণ কিংবা হত্যা কিছুই করা হয়নি। গত ৪ জুলাই সে ইকবাল পন্ডিত (২৭) নামে এক ছেলের সাথে পালিয়ে যায়। পরে তাকে বিয়ে করে সংসার করতে থাকে। নিখোঁজ হওয়ার ৫১ দিন পর গত ২৩ আগস্ট মায়ের সাথে যোগাযোগ করে জিসা। এরপর বিষয়টি সামনে আসে। এদিকে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে আসামিরা জেলে। আসামির স্বজনদের অভিযোগ, পুলিশি নির্যাতনের মুখে মিথ্যা জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। জিসা মনির ঘটনায় নির্দোষ তিনজন জেল খাটছে। তাদের মুক্তি মিলবে কিনা তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় স্বজনরা। নারায়ণগঞ্জের বন্দরের একরামপুর এলাকায় স্ত্রী ও তিন কন্যাকে নিয়ে থাকতেন খলিল (৩৬)। শীতলক্ষ্যা নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা চলতো তার। কথিত জিসা মনিকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে সে এখন জেলে। স্ত্রী শারমিন আক্তার বলেন, সবাই কইতাছে মাইয়ারে পাইয়া গেছে আসামি তো ছাইড়া দেওনের কথা। কিন্তু তারে তো ছাড়তাছে না। কইতাছে তাগোরে আবার রিমান্ডে নিবো। খলিলের বড় ভাই আব্দুল জলিল বলেন, আমার ভাই মুর্খ মানুষ। দশজনের লগে তেমন চলাফেরা নাই। চালাকি কইরা যে কিছু একটা কইবো তার কোন বুঝ নাই। মাইরের ডরে পুলিশ যা কইছে তাই তাই আদালতে কইছে। তিনি বলেন, স্বামী নিয়ে জিসা মনির জীবিত ফিরে আসাতে ধর্ষণ ও হত্যার জবানবন্দি যে মিথ্যা তা প্রমাণ হইছে। পুলিশ মাইরা এই মিথ্যা জবানবন্দি দেওয়াইছে। এখন চাকরি বাঁচাইতে পুলিশ কী করবো তার দিশা পাইতাছে না। ওর নৌকাটাও আটকাইয়া রাখছে। নৌকাটা ভাড়া দিয়া যে সংসারটা চলবো তাও সম্ভব না। আদালতের সামনেই কথা হয় এই মামলায় গ্রেফতার প্রধান আসামি আব্দুল্লাহ’র পরিবারের লোকজনের সাথে। কান্নাজড়িত কন্ঠে আব্দুল্লাহ’র বাবা বন্দরের বুরুন্ডি খলিলনগর এলাকার আমজাদ হোসেন বলেন, ‘আমার পোলাডার বয়স কম। এখনও বিয়ে-শাদিও করে নাই। মিথ্যা মামলায় পোলাডার জীবনটাই নষ্ট কইরা দিল।’ ছেলের জামিনের জন্য উকিল ঠিক করেছেন বলে জানালেন খলিলের স্ত্রী শারমিন আক্তার ও আব্দুল্লাহ’র বাবা আমজাদ হোসেন। গত ২৪ তারিখ সকালে খলিলের জামিন আবেদন করা হয় আদালতে। তখনও আদালতে জিসা মনিকে তোলা হয়নি। আদালত খলিলের জামিন নামঞ্জুর করেন। এরপর বিকেলে জিসা মনি আদালতে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ২২ ধারায় জবানবন্দি দেয়। পুলিশ ও জিসা মনির পরিবার সূত্রে জানা যায়, নগরীর দেওভোগের এলএন রোডের ২৩নং সরকারি পঞ্চম শ্রেণির স্কুল ছাত্রী জিসা মনি গত ৪ জুলাই নিখোঁজ হয়। বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুজির পর ১৭ জুলাই সদর মডেল থানায় একটি জিডি করেন জিসার বাবা জাহাঙ্গীর হোসেন। এক মাস পর ৬ আগস্ট একই থানায় অপহরণ মামলা দায়ের করেন। এই মামলায় গ্রেফতার করা হয় আব্দুল্লাহ, রকিব ও খলিলকে। গত ৯ আগস্ট জিসা মনিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ নদীতে ভাসিয়ে দেয়ার কথা উল্লেখ করে আদালতে জবানবন্দি দেয় তারা। সবাইকে অবাক করে দিয়ে গত ২৩ আগস্ট দুপুরে স্বামীকে সাথে নিয়ে সুস্থ অবস্থায় ফিরে আসে জিসা মনি। এ ঘটনায় জেলাজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। পুলিশের তদন্ত ও আদালতে দেওয়া জবানবন্দি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। জীবিত ব্যক্তিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ ভাসিয়ে দেওয়ার জবানবন্দি কেন দিলো আসামিরা এর কোন সদুত্তর নেই পুলিশের কাছে। এই ঘটনার তদন্তের স্বার্থে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিবি) জাহেদ পারভেজ চৌধুরীকে প্রধান করে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার ও জেলা পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তা পরিদর্শক ইকবাল হোসেনকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সদর মডেল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শামীম আল মামুনকে পরিবর্তন করে পরিদর্শক আব্দুল হাইকে দেওয়া হয়েছে। দেওভোগের এলএন রোডের নিজ বাসাতে কথা হয় জিসা মনির সাথে। সে জানায়, ঘটনার দিন পূর্বপরিচিত আব্দুল্লাহ’র সাথে দেখা করতে শহরের কেন্দ্রীয় বাস স্ট্যান্ডে আসে সে। তাকে রেখে চিপস কিনতে যায় আব্দুল্লাহ। পরে ফিরে না আসায় প্রেমিক ইকবাল পন্ডিতকে ফোন দেয় জিসা। ইকবাল এসে তাকে ঢাকার যাত্রাবাড়ি নিয়ে যায়। পরে সেখানে তারা বিয়ে করে। বিয়ের পর বন্দরের নবীগগঞ্জ কুশিয়ারা এলাকায় গত দেড় মাস ছিল। এদিকে তাকে অপহরনের দায়ে আব্দুল্লাহসহ তিনজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এ বিষয়টি জানতো না বলে দাবি জিসা মনির। জিসা মনি ফিরে আসার পর তাকে অপহরনের মামলায় স্বামী ইকবাল পন্ডিতকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ইকবাল পন্ডিত যাত্রাবাড়ির মাতুয়াইলের মৃত সোহরাব পন্ডিতের ছেলে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৫ দিনের রিমান্ড আবেদন করে আদালতে পাঠানো হয়েছে। আজ ২৭ আগস্ট রিমান্ড শুনানি হবে। কথা হয় জিসা মনির বাবা জাহাঙ্গীর হোসেনের সাথে। মেয়েকে ফিরে পেলেও মেয়ের জামাই এখন তাকে অপহরনের দায়ে হাজতে। তাকে জামিনে ছাড়িয়ে আনার চেষ্টা করছেন বলে জানালেন জাহাঙ্গীর। তিনি বলেন, মেয়ে তো পাইছি। আসামিদের বিরুদ্ধে এখন আর কোন অভিযোগ আমার নাই। কিন্তু এখন পড়ছি নতুন ঝামেলায়। মেয়ের জামাই তো হাজতে। তারে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতাছি। কী করমু বুঝতাছি না। পুলিশ-প্রশাসন যেভাবে বলতেছে সেভাবেই কাজ করতেছি।
গোপনীয়তা নীতি | এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।