
এস ইসলাম, নাটোর জেলা সংবাদদাতা :
“সবজি নিবেন গো সবজি” হাক ডাকা এক ফেরিওয়ালা সবজি খালার সত্যিকারের জীবন সংগ্রামের কাহিনী শোনাতে চাই পাঠকদের । পাঠকরাই মূল্যায়ন করবেন কে সত্যিকারের জয়িতা । নাম তাঁর হাজেরা বেগম । বয়স ৩৬ বছর । ময়লা পুরাতন জামা কাপড় পরে ভ্যানবোঝাই হরেক রকমের কুড়িয়ে আনা শাকসবজি। ভ্যান চালিয়ে ছুটে চলেছেন নাটোর শহরের বাজারে, পাড়া-মহল্লায়। ক্লান্ত অবসন্ন শরীর নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে ধরার জন্য কখনো কখনো ঠেলে ঠেলে এপাড়া–ওপাড়ায় ঘুরে বেড়ান। সবজি বিক্রি করার কারনে পাড়া মহল্লার লোকজন সবজি খালা নামে পরিচিত । ১২ বছর ধরে শাকসবজি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছেন তিনি । তবে প্রথমে মাথায় করে শাকসবজির ডালা নিয়ে পায়ে হেঁটে হেঁটে পাড়া মহল্লায় ঘুরে ঘুরে সবজি বিক্রি করতে খুব কষ্ট হতো । বছর চারেক আগে কোন এক হ্রদয়বান ব্যক্তি দুই হাজার টাকা দান করেছিলেন । আর নিজের কাছে ছিল এক হাজার টাকা । এই তিন হাজার টাকায় পুরাতন লক্করঝক্কর ভ্যানটা কিনেছিল । আর সেটা নিয়েই জীবন সংগ্রামে পথ চলা শুরু করল স্বামী পরিত্যক্তা হাজেরা বেগম । প্রতিদিন আয় হয় দুই শত থেকে তিন শত টাকা । সেটা দিয়েই কোন মতো চলে বৃদ্ধ মা তিন শিশু সন্তান সহ পাঁচ সদস্যের সংসার । নাটোর সদর উপজেলার একডালা গ্রামের মৃত দলি উদ্দীন মোল্যার মেয়ে হাজেরা । ছেলে-মেয়ে নিয়ে হাজেরা বেগম থাকেন বাবার ভিটায় । ভিটেমাটি ছাড়া আর কিছুই সহায় সম্পত্তি নাই । হাজেরা বলেন, ছোট বেলায় বাবা মারা যাওয়ার পর বড় সন্তান হিসেবে ১১বছর সংসারের হাল ধরতে রাজমিস্ত্রীর যোগালদারের কাজে যোগদেন । ২০ বছর আগে ভ্যান চালক সেকেন্দারের সাথে বিয়ে হয় ।তাদের ঘরে এক ছেলে ও দুই মেয়ে হয় । এরপর আমাদের ছেড়ে এক যুগ আগে স্বামী আরেকটি বিয়ে করে বাড়ি ছেড়ে চলে যান । হাজেরা কিংবা তাঁর সন্তানদের কোনো খোঁজখবর নেন না ভরণপোষণের খরচও দেন না । ছেলে-মেয়েকে নিয়ে হাজেরা পড়েন অথই সাগরে । কি খাবেন, কী পরবেন , এই নিয়ে দুশ্চিন্তায় চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসে । এমন পরিস্থিতিতে একমাত্র ছোট ভাই তার বউকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায় । মায়ের সাথে যোগাযোগ বিছিন্ন করে দেওয়ায় মা অসুস্থ হয়ে পড়েন, টাকার অভাবে ঠিক মতো চিকিৎসা করাতে পারেননি । রাজমিস্ত্রীর কাজ করতে গিয়ে মেরুদন্ডে ব্যথা পাওয়ায় রাজমিস্ত্রীর কাজ বন্ধ হয়ে যায় । ছোট তিনটি বাচ্চা আর বিছানাগত বৃদ্ধ মায়ের অসহায় মুখ দেখে তিনি খুব ভেঙ্গে পড়েন । এদের মুখে খাবার তুলে দিতেই শুরু করে শাকসবজির ব্যবসা । শুরুতে জড়তা ছিল, ছিল লোকলজ্জার ভয়। লোকে বাঁকা চোখে তাকাতেন। কিন্তু তিনি থেমে যাননি। হাজেরা আরও বলেন, প্রতিদিন কাকডাকা ভোরে ঘুম থেকে ওঠে নিজের ভ্যান নিয়ে বেরিয়ে পড়েন । এলাকার খালবিল, পুকুর থেকে শাপলা, কলমি, হেলেঞ্চা এবং বাগান থেকে কচু, কচুর ডগা, কচুর লতি, ঘাটকোল, থানকুনি পাতা সংগ্রহ করেন । এরপর ভ্যান চালিয়ে এসব নিয়ে প্রথম যান নাটোর শহরের ষ্টেশন বাজারে কিংবা নিচাবাজারে । সেখানে কিছু সময় বিক্রি করে চলে যান শহরের বিভিন্ন অলিগলিতে । এত দিনে বাসাবাড়ির মানুষগুলোর মুখ ও নাম তাঁর মুখস্থ । এসব চেনা মুখ দেখে তাঁর ভালো লাগে । বিশেষ করে লোকে যখন তাঁকে সবজি খালা বলে ডাকে, তখন তিনি সব দুঃখ ভুলে যান । মন তাঁর আনন্দে ভরে ওঠে । কিছুদিন পূর্বেও মেরুদন্ডের ব্যথাটা বেড়েছে । তাই লক্কর ঝক্কর ভ্যানটা প্যাডেল মেরে চালিয়ে শহরময় ঘুরতে পারেননা না । তাই সংসার চালাতে খুব কষ্ট হচ্ছে । সাংবাদিক আব্দুল মজিদ ও আরেফিন কাজল জানান, নাটোর শহরে থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে, দুপুরে বৃষ্টির মাত্রাটা প্রবল হলো । সবাই বৃষ্টি থেকে বাঁচতে দৌঁড়াদৌঁড়ি করছে ।কেউ দোকানে কেউবা বাসাবাড়ির দিকে আশ্রয় খুঁজছে । সবাই যখন নিজেকে রক্ষায় ব্যস্ত তখনও ভারি বৃষ্টিতে ভিজে পামহীন চাকার ভ্যানে আর ঝংধরা চেইনের প্যাডেলে সর্বশক্তি দিয়ে ভ্যান চালিয়ে সবজি বিক্রি করছেন সবজি খালা হাজেরা বেওয়া । বৃষ্টির পানি , ঘাম আর চোখের পানি মিলে মিশে একাকার সবজি খালা । দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে এখনো চাল ডালের টাকাও উঠেনি । তিনি বাজার নিয়ে গেলেই যে মা আর সন্তানের মুখে খাবার তুলে দিতে পারবে । অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা ভেবেই তিনি চোখে অন্ধকার দেখছি । সবজিখালা বলেন এখন বৃষ্টিতে ভিজে আর রোদে পুড়ে জিবনের চাকা ঘুরাতে হচ্ছে । তাও আবার বাসা বাড়িতে সবজি বিক্রির সময় সবাই কাছে আসেনা । দুর থেকেই সব করতে হয় । করোনা প্রায় জিবনটাকে শেষই করে দিলো । যদি একটা মেশিন লাগানো পুরনো ভ্যান কিনতে পারতাম, তাহলে শহরময় ঘুরে ঘুরে সবজি বিক্রী করে জীবন বাঁচাতে পারতাম । অভাবের কারণে ছেলেটাকে লেখাপড়া বন্ধ করে টাইলস মিস্ত্রীর হেলপারের কাজে দিয়েছেন । সরকারি-বেসরকারি-ব্যক্তিগত পর্যায়ে অনেক উদ্যোগ নেওয়ার পরও বহু মানুষ সহায়তা কার্যক্রমের বাইরে রয়ে গেছেন মন্তব্য করে তেবাড়িয়া ইউপির সাবেক মেম্বার রহমত আলী বলেন, সত্যিই সবজি খালা হাজেরা অনেক অসহায় । কিন্তু উদয়াস্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করার পরও তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করেন । কোরআন শরীফ তেলোওয়াত করেন । সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি সবজিখালা কে মেশিন লাগানো একটি ভ্যান দেয়া গেলে পরিবারের সদস্যরা বেঁচে যেত । সমাজকর্মী ও সাংবাদিক কমী আল আফতাব সুইট বলেন আমার দৃষ্টিতে সবজিখালা নাটোর জেলায় সংগ্রামী নারীর প্রতিকৃতি । অনেক কষ্ট করে সৎভাবে, হালাল উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করার জীবন্ত উদাহরণ হাজেরা বেওয়া । শাকপাতা কুড়িয়ে বিক্রি করে সৎভাবে জীবন যাপন করাই আমার জীবনের লক্ষ্য । তার খুব বেশি চাওয়া পাওয়া নেই । একটি মেশিন চালিত ভ্যানগাড়ী যদি সমাজের সহৃদয়বান ব্যক্তিদের পাশে দাঁড়ানো জন্য হাজেরা আকুল আবেদন করেছেন । আজকের মতো সবজি খালার কাহিনী শেষ করার আগে পাঠকদের অনুরোধ জানাই, আপনারাই মূল্যায়ন করুন, সত্যিকারের জয়িতা কে ? সৎভাবে , হালাল উপার্জন করে জীবিকা নির্বাহ করা হাজেরা বেওয়া, নাকি তেল মেরে উপরে উঠা বিত্তবানরা
গোপনীয়তা নীতি | এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।