রূপগঞ্জের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে তিতাসের অবৈধ গ্যাসের সংযোগ। আর এসব সংযোগের ৯৫ ভাগই দেওয়া হয়েছে নিম্নমানের পাইপ এবং সামগ্রী দিয়ে। জরাজীর্ণ লোহার পাইপ, এমনকি মাটির ওপর দিয়ে প্লাস্টিকের পাইপের মাধ্যমেও দেওয়া হয়েছে অবৈধ সংযোগ। অবৈধভাবে নিম্নমানের পাইপ স্থাপন, রাইজার, রেগুলেটরের মাধ্যমে গ্যাস সংযোগ নেওয়ায় প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। প্রতি আবাসিকে অবৈধভাবে সংযোগে নেওয়া হয়েছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। তিতাস গ্যাস অফিস থেকে বিচ্ছিন্নের পর দালাল চক্র পুণরায় সংযোগের জন্য নিচ্ছে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। অধিক পরিমাণে অবৈধ গ্যাস সংযোগের কারণে আবাসিক খাতের বৈধ গ্রাহকরা গ্যাস পাচ্ছেন না। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে বারবার হামলার শিকার হওয়ায় এখন বিচ্ছিন্ন করতে যায় না তিতাস কর্তৃপক্ষ। রূপগঞ্জ জুড়ে প্রায় ৩০ হাজারের মতো অবৈধ আবাসিক গ্যাস সংযোগ হবে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে বাণিজ্যিক সংযোগ রয়েছে প্রায় দুই হাজার। ফলে নিম্নমানের পাইপের কারণে সংযোগগুলোতে দেখা দিয়েছে বহু লিকেজ। এতে একদিকে সরকার যেমন কোটি কোটি টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে, অপরদিকে, এসব অবৈধ সংযোগ থেকে ঘটছে দুর্ঘটনা। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে বহু হতাহতের পর অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারটি ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়েছে রূপগঞ্জের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রূপগঞ্জের বিগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি তিতাস গ্যাস আবাসিক সংযোগ দেওয়া বন্ধ করার পর থেকেই বৃদ্ধি পায় এই অবৈধ সংযোগ নেওয়ার তোড়জোড়। আর এই সুযোগটি কাজে লাগান তৎকালীন আওয়ামীলীগ সরকারের আমলে দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাকর্মী এবং অসাধু দালালচক্র। তাদের সমন্বয়ে গড়েওঠা সিন্ডিকেট প্রতিটি আবাসিক অবৈধ গ্যাস সংযোগের জন্য নিয়েছে ৫০-৬০ হাজার করে টাকা।
উপজেলার তারাবো, বিশ্বরোড, মৈকুলি, খাদুন, কাহিনী, মুড়াপাড়া, বানিয়াদি, হাটাবো, কালি, আমলাবো, কাঞ্চন, নলপাথর, গোলাকান্দাইল, হোড়গাঁও, ডরগাঁও, সাওঘাট, ভুলতা, গন্দরবপুর, রূপসি, নতুন বাজার, বরপা, আড়িয়াবো, সুতালারা, পাড়াগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় রাতে রাস্তা কেটে হাইপ্রেসার লাইন ছিদ্র করে ২-৩ ইঞ্চি এবং ১ ইঞ্চি নিম্নমানের লোহার বা প্লাস্টিকের পাইপ দিয়ে নেওয়া হয়েছে এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ। নিম্নমানের পাইপের কারণে খুব অল্পদিনেই এসব সংযোগে তৈরি হয়েছে লিকেজ। অবৈধ গ্যাস সংযোগ সহজলভ্য হওয়ায় নতুন বাড়িঘর এবং বহুতল ভবনগুলোতেও অবৈধ সংযোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব সংযোগের জন্য কোনো ধরনের মাসিক বিল দিতে হয় না গ্রাহককে। এতে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গেল কয়েক বছরে উপজেলার রূপসী এলাকার নয়ানগর জামে মসজিদের সামনে দুবার তিতাস গ্যাসের লাইনের লিকেজের কারণে আগুন ধরে যায়। অবৈধ গ্যাস সংযোগ গ্রহীতাদের মধ্যে একজন গোলাকান্দাইল এলাকার রমেশ চন্দ্র পাল জানান, আমার বাসায় গ্যাস সংযোগের জন্য দালাল চক্রকে ৫০ হাজার টাকা দিয়েছি। সাথে বাড়ির দলিল, পর্চা ও ছবিও জমা নিয়েছেন। তিনি বলেছেন দ্রুত গ্যাস সংযোগটি বৈধ করে দেবেন। কিন্তু আর বৈধ করে দেয়নি, তাই বর্তমানে অবৈধভাবেই গ্যাস ব্যবহার করছি।
তবে, অবৈধভাবে সংযোগ নেয়া গ্রাহকদের অভিযোগ, তারা ধার দেনা করে, গরু বাছুর, স্বর্ণালংকারসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র বিক্রি করে গ্যাস সংযোগের জন্য টাকা দিয়েছেন দালাল চক্রকে। দালাল চক্র এসব অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া গ্রাহকদের বুঝিয়েছেন তাদেরকে সরকারিভাবে বৈধ করে দিবেন। এখন দালাল চক্রকে টাকা দিয়ে বিপাকে পড়েছেন অবৈধ সংযোগ নেওয়া গ্রাহকরা। দালালচক্ররা বৈধ করে দিচ্ছেন না। অবৈধ সংযোগ নেয়া গ্রাহকদের দাবি, তাদের সংযোগ গুলো যাতে বৈধ করে দো হয় ।
স্থানে সূত্রে জানা যায়, গত ২০২৪ সালের ২৬ অক্টোবর ডহরগাঁও এলাকায় অবৈধভাবে গ্যাস সংযোগ নেয়া গ্যাস পাইপলাইন থেকে লিখেজ হয়ে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে এতে ছয় জন দগ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
২০২৩ সালের ২৭ এপ্রিল রূপসি এলাকায় রূপসী-কাঞ্চন সড়কে হাই প্রেসার পাইপ লাইন থেকে অবৈধ সংযোগ নেওয়া সার্ভিসটি থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে প্রায় ১২ ঘণ্টা ওই এলাকায় গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকে। পরে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ পাইপলাইন মেরামত করলে পুণরায় গ্যাস সংযোগ পান।
২০১৯ সালে ২১ এপ্রিল ঢাকা সিলেট মহাসড়কের সাওঘাট এলাকায় হাই প্রেসার তিতাস গ্যাসের পাইপ লাইন থেকে একটি পাকা বাড়িতে অবৈধভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ নেয়া হয়। সেখানে পাইপ লাইন লিকেজ হয়ে বিকট শব্দে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই শামীম ও হেলাল বিশ্বাস নামের দুজন নিহত হন। আহত হন আরো ৬ জন। বিস্ফোরণে ওই বাড়ির দেওয়াল উড়ে যায়।
২০২০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর বানিয়াদি এলাকায় অবৈধভাবে আবাসিক গ্যাস সংযোগ নেওয়া দুইটি রাইজার থেকে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আগুন ধরে যায়।
২০২২ সালের ১৪ মার্চ কাঞ্চন এলাকায় অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে হামলার শিকার হন তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। এ সময় গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। পরে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে ব্যর্থ হয়ে তারা ফিরে যান।
২০২৩ সালের ৩ জানুয়ারি গোলাকান্দাইল, বাঘমুঙা হিজর গাছ পর্যন্ত প্রায় ৬ শতাধিক অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে তিতাস গ্যাস কর্তৃপক্ষ। পরে দালাল চক্র পুণরায় সংযোগ দিয়ে দেয়।
২০১৯ সালের ১৩ নভেম্বর মইকুলি ও বরপা এলাকায় প্রায় দুই হাজার অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয় । পরে পুণরায় দালাল চক্র গ্যাস সংযোগ দিয়ে দেয়।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করায় ২০২১ সালের ২৮ মে যাত্রামুঙা তিতাস গ্যাস অফিসে হামলা করে অবৈধ গ্যাস সংযোগ নেয়া লোকজন।
কায়েতপাড়া এলাকায় বিশেষ কায়দায় বেলুনে গ্যাস মজুদ রেখে ব্যবহার করে ওই এলাকার মানুষ। পরে এ বিষয়ে তিতাস কর্তৃপক্ষের নজরে আসলে ২০২১ সালের ৩০ মার্চ ওই এলাকার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হয়।
২০২২ সালের ১৪ নভেম্বর খাদুন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে ৩০০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। পরে দালাল চক্র আবার গ্যাস সংযোগ দিয়ে দেয়।
একই বছরে ৫ সেপ্টেম্বর আদুরিয়া ও মোহন এলাকায় ৫০০০ অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়। ওই এলাকায়ও দালাল চক্র মোটা অংকের টাকা নিয়ে পুণরায় গ্যাস সংযোগ দিয়ে দেয়।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে ২০২২ সালের ২ জুলাই বড় এলাকায় হামলার শিকার হন তিতাস গ্যাসের বিচ্ছিন্ন কারী দলের সদস্যরা। এতে অন্তত ১০ জন আহত হয়।
অবৈধ গ্যাস সংযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডের যাত্রামুড়া কার্যালয়ের উপ-মহাব্যবস্থাপক সিদ্দিকুর রহমান জানান, অবৈধ সংযোগগুলোতে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় পাইপে এই লিকেজের সৃষ্টি হচ্ছে। ঘটছে বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনা। অবৈধ গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্নের অভিযান চলমান রয়েছে। তবে এ ব্যাপারে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন।
গোপনীয়তা নীতি | এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।